প্রকৃতপক্ষে সুখী দম্পতি ইন্টারনেটে ছবি কম দেন!

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নেটাগরিকদের কাছে অক্সিজেনের মত। দিনের শুরু থেকে রাতে ঘুমোনোর আগ পর্যন্ত সকল কাজের কৈফিয়ত দেওয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেদেয়া যেন বাধ্যতামূলক। এই বাধ্য হতে হতে এমন হয়েছে যে প্রিয়জনের সাথে সারাদিন কয়েকশ’ ছবি দিলেও তার সাথে দু’টো কথাও বলার সময়ও হয়ত হয়ে উঠছে না।

তাহলে এই যে সুখী দম্পতিদের হাজারো ছবি নেট দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ায় প্রত্যেকদিন তাদের কয়জন প্রকৃতপক্ষে সুখী? প্রকৃতপক্ষে কোন দম্পতি সুখী তার খোঁজ মিলেছে সম্পর্কবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটের গবেষণায়।গবেষণায় দেখা যায়, সে সকল দম্পতি সুখী, নেট দুনিয়ায় তাদের বিচরণ ও কার্যক্রম কম। গবেষকরা কয়েকটি যুক্তিও দিয়েছেন তাদের ফলাফলের পক্ষে।

প্রমাণ করার দরকার নেই
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুখী সংসারের ছবি দেয়ার মানে আপনি বোঝাতে চান আপনি কতটা সুখী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যারা সুখী তাদের নেট দুনিয়ায় প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই তারা কতটা সুখী। তাই তারা নেট দুনিয়ায় নিজেদের ছবি কমই দিয়ে থাকেন।

আত্ম-মগ্নতা
যে সকল মানুষ নিজেদের সকল প্রাত্যহিক জীবনের সকল কার্যক্রম অতিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন তারা আত্মমগ্নতা বা “নার্সিজম” এ ভুগছেন বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এ ধরনের ব্যক্তিরা অন্যের কাছ থেকে নিজের প্রশংসা শুনতে চায়, অন্যরা তাদের নিয়ে কতটা আগ্রহী সেটা দেখিতে চায়, একই সাথে নিজেদের অনুসারী তৈরি করতে হয়। তারা বাস্তব জীবনে একাকী ও নিঃসঙ্গ। এ ধরনের মানুষের বাস্তব জীবন নেট দুনিয়ার থেকে পুরোপুরি উলটো থাকে বলেই তারা আত্মমগ্নতায় ভোগে।অপরদিকে যে সকল দম্পতি একে অপরকে সময় দেয়, একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা ও প্রশংসার প্রকাশ করে থাকেন তাদের অন্য কারও কাছ থেকে প্রশংসার প্রয়োজন হয় না। এজন্যই তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাম্পত্যের ছবি কম প্রকাশ করেন।

প্রতিটি মূ’হুর্ত একত্রে উপভোগ করা
যে সকল দম্পতি নিজেদের প্রতি মুহুর্ত একসাথে কাটায় ও উপভোগ করে। তাদের আলাদাভাবে নেট দুনিয়ায় মুহুর্তগুলোকে প্রকাশ করার প্রয়োজন পরে না। কারণ তাদের কাছে ছবির তুলনায় সামনের মানুষটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে বেশি বেশি ছবি দিয়ে একত্রে সময় কাটাচ্ছেন মনে করা দম্পতিরাই বাস্তবে একে অপরের থেকে কখন দূড়ে সরে গেছেন তা নিজেরাও জানেন না।

প্রতিযোগিতা নয়
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোনো প্রতিযোগিতার মাঠ নয় যে এখানে কে কতটা সুখী, কার জীবন কতটা আরামের তা ছবি দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। অনেকেই মনে করেন যদি আমি ছবি না দেই তবে অন্যরা ভাববে আমি সুখী নই। যা একদমই ভুল ধারণা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিশ্চয়তা দেয় না
নেট দুনিয়ায় ছবি দিলেই যে দাম্পত্য সুখের হবে তার কিন্তু কোনও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু আপনার সঙ্গীকে সময় দেওয়া, তার যত্ন নেওয়া, ছোট খাট বিষয় নিয়ে গল্প করার মধ্যে অবশ্যই সুখী দাম্পত্যের চাবিকাঠি লুকানো রয়েছে। তাই প্রিয়জনের সাথে যথেষ্ট সময় কাটান, তাদের মনের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন আর নেট দুনিয়া থেকে একটু দূড়ে থাকুন।

যারা বাস্তব জীবনে যত অসুখী, তারা ফেসবুকে নিজেদের তত সুখী
ডা. তারাকী হাসান মেহেদী:

আসলে যারা বাস্তব জীবনে যত অসুখী, তারা ফেসবুকে নিজেদের তত সুখী প্রমাণ করার চেষ্টা করে। শো অফ করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আগের যুগে মেয়েরা নতুন ড্রেস, গহনা কিনলে পাশের বাসার ভাবীর বাড়িতে কোন এক ওসিলায় গিয়ে দেখিয়ে আসত। এখন ফেসবুকের কল্যাণে বাসায় আর যাওয়া লাগে না। এক ছবি আপলোডেই সবাই তা দেখে।

ফেসবুক যতটা না সোশ্যাল মিডিয়া, তার চেয়ে এটি হল শো অফের জায়গা। ছয়দিনই আনহ্যাপি থাকা মানুষ ঝগড়া, অশান্তির ব্যাপারে কিছু বলবে না, কিন্তু একদিন কোন গিফট পেলে বা কোথাও গেলে সেটাই সবাইকে জানিয়ে বুঝাবে কত হ্যাপি তারা!! আর সেটা দেখে ছয়দিন হ্যাপি থাকা মানুষরা আফসোস করে হবে আনহ্যাপি।

আমি অনেককেই দেখেছি নতুন ড্রেস কেনে শুধুমাত্র সে ড্রেসের ছবি ফেসবুকে আপলোড দেওয়ার জন্য, রেস্টুরেন্টে খেতে যায় ছবি তুলে চেক ইন দেওয়ার জন্য, বেড়াতে যায় নতুন জায়গায় ছবি তুলে সবাইকে দেখানোর জন্য…ছবি তোলা শেষ, অমনি ঘোরাও তখন শেষ। এমনকি কেউ কেউ আছে বিয়ের অনুষ্ঠানই করে শো অফের উদ্দেশ্যে”।

আজকের হট টপিক তাহসান-মিথিলা… মিডিয়ায় তারা যেভাবে নিজেদের উপস্থাপন করত, সেটা দেখে তাদেরকে বেশিরভাগ মানুষই (বিশেষ করে মেয়েরা) পার্ফেক্ট কাপল, আদর্শ জুটি মনে করত। কিন্তু তাদের ডিভোর্সের ঘো’ষণা সবাইকে হতবাক করে দেয়। অথচ এই জুটিকে আমার হৃদয় খান- সুজানা, হাবিব-রেহান বা শখ-নিলয়ের চেয়ে বেশি কিছু কখনো মনে হয় নি।

সেলেব্রেটিদের আমি কখনোই ব্যক্তিগত জীবনে আদর্শ মানি না… তাদেরকে জনগনের বিনোদনের খোরাক ছাড়া এর বেশি কিছু মনে হয় না… তাদের পুরো জীবনটাই শো অফ ছাড়া আর কিছু না।

বিয়ে একটা করতে হয় দেখে করে, এছাড়া পরিবারের বন্ধন এদের কাছে গুরুত্ব নয়। এই কারণে তাদের মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদের হারও অনেক বেশি। স্বামীর কি দায়িত্ব, স্ত্রীর কি কর্তব্য, সেটা যতটা না বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে নিজের ক্যারিয়ার ঠিক রাখাই তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকে বলতে পারেন, আপনি হিংসা করছেন। কিংবা আপনি তাদের মত হতে পারেন নি বলেই এভাবে কথা বলছেন। কথা হল, যারা নাটক, সিনেমা, গান, নৃত্য, মডেলিং এর সাথে যুক্ত, তারা কোরআন হাদিসের ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী শ’য়তানের পথে ও জাহান্নামী (যদি না এসব বাদ দিয়ে তওবা করে)। তাহলে, জেনে শুনে কোন যুক্তিতে জাহান্নামীদের হিংসা করব? হোক সেটা শাহরুখ, সালমান কিংবা তাহসান। আমার চোখে সবাই সমান।

মিডিয়ার কেউ কখনো আদর্শ হতে পারে না… আদর্শ কাপল দেখতে হলে নিজের মা বাবাকে দেখুন… শত উত্থান পতনের মাঝেও তারা সারা জীবন একসাথে সংসার করছে…

কিংবা যখন সত্তর বছরের বৃদ্ধ তার অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসা করানোর জন্য আমার কাছে আসে, তাদের দেখে মনে হয় আদর্শ কাপল। যে স্বামী তার শরীরের ঘাম ঝরিয়ে শুধুমাত্র তার স্ত্রী ও সন্তানের জন্য আয় করে, আর যে স্ত্রী স্বামী বাসায় না ফেরা পর্যন্ত নিজে না খেয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে, তারাই হল আদর্শ কাপল।

ফেসবুকে হাসিখুশি ছবি, কিছু প্রেমের গান গেয়ে কিংবা লুতুপুতু অবাস্তব প্রেমের নাটক করে নিজেদের উপস্থাপন করলেই হ্যাপি কাপল, আদর্শ কাপল হওয়া যায় না। ডিভোর্স জিনিসটা শয়তানের অনেক পছন্দের। শয়তান শুধু সুযোগ খুঁজতে থাকে, কিভাবে ডিভোর্স ঘটানো যায়।

রাসূল (সা) বলেছেন, “নিশ্চয় ইবলিস পানির ওপর তার সিংহাসন বসায়। অতঃপর তার শিষ্যদের পাঠায় (মানুষকে বিপথগামী করার জন্য)। তার শিষ্যদের মধ্যে তার কাছে সবচেয়ে নিকটবর্তী সেই হয় যে সবচেয়ে বড় ফিতনা তৈরি করতে পারে।

শিষ্যদের মধ্যে কেউ ফিরে এসে জানায়, আমি ওটা করেছি, সেটা করেছি। ইবলিস বলে, এটা তেমন কিছু করো নি। অতঃপর একজন এসে জানায়, আমি অমুককে ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়ি নি, যতক্ষণ না তার ও তার স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি। ইবলিস তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে, “হ্যাঁ তুমি বেশ করেছ।” (সহীহ মুসলিম)

বিয়ে হল আল্লাহর একটা বড় নিয়ামত… যথাযথ কারণে বিয়ে বিচ্ছেদ বা তালাক বৈধ হলেও এটি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয়। রাসুল (সা) বলেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল হচ্ছে তালাক”। (সুনান আবু দাউদ)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ থেকে হেফাজত করুন। নিজের পারিবারিক জীবনকে নিজের মত করেই ভাবা উচিত, সেভাবে চলা উচিত। যখনই অন্য কারো জীবনের সাথে তুলনা করবেন, তখনই খারাপ লাগা শুরু হবে। আসলে, দুনিয়ার কেউই সুখী নয়। কেউ আছে সুখে থাকার চেষ্টা করে, আবার কেউ আছে সুখে থাকার অভিনয় করে।

আর হ্যা, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে কখনো তৃতীয় পক্ষকে নিয়ে আসা উচিত না। যখনই তৃতীয় পক্ষ আসে, শয়তানও তার সাথে আসে… আর সেই সাথে অশান্তিও ডেকে নিয়ে আসে, যারই চুড়ান্ত ফলাফল এই বিচ্ছেদ।